offbeat news

ওপারে তখন সন্তানের মৃত্যু সংবাদ, যে ছবিটা হৃদয় ছিঁড়ে দিচ্ছে তার পিছনের গল্পটা আরও কঠিন

নয়াদিল্লি: রাস্তা দিয়ে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কয়েকটা লোক। কারও মাথায় ভারী বোঝা, কেউ ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ছেন রাস্তায়। যেদিন থেকে আমরা ঘর বন্দি, সেদিন থেকে এমন দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ছে। কিন্তু লকডাউনের নতুন নতুন রেসিপির পাশে এসব ছবি বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে। টাইমলাইনে আসে আবার হারিয়েও যায়। তবু এর মধ্যে কিছু ছবি বুকে বেঁধে। তাকালেই কেমন যেন অস্বস্তি হয়। কয়েক মুহূর্তের জন্য চোখ আটকে যায়।
সম্প্রতি সেরকম কয়েকটা ছবি নিয়ে তোলপাড় হয়েছে দেশ। কিন্তু ছবির থেকেও গল্পটা আরও কঠিন। ছবি দেখে যদি চোখে জল আসে, তাহলে গল্পটা হয়ত পাথর করে দেবে।
একজন প্রাপ্ত বয়স্ক লোক কানে মোবাইল দিয়ে রাস্তার ধারে বসে হাউ হাউ করে কাঁদছেন। মুখ থেকে খুলে পড়ছে মাস্ক। স্বভাবসিদ্ধভাবেই এমন একটা দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করে ফেলেন পিটিআই-এর ফটোগ্রাফার অতুল যাদব।
না, এই দৃশ্য তাঁর কাছে নতুন নয়। গত কয়েক দিনে এমন বহু দৃশ্য দেখে ফেলেছেন তিনি। সাংবাদিকদের তো হৃদয় ভাঙলে চলে না! তাই তড়িঘড়ি ছবি তুলে ফেলেন তিনি। জায়গাটা ছিল দিল্লির নিজামুদ্দিন ব্রিজ। ব্রিজের তলা দিয়ে যাচ্ছে যমুনা নদী।
তবু চিত্র সাংবাদিকেরাও তো মানুষ! তাই, তিনি ছুটে ক্যামেরা ফেলে ছুটে যান লোকটার কাছে। কান্না কেন? যন্ত্রণাটা কীসের? খেতে না পাওয়া? নাকি কাজ হারানোর কষ্ট? না, যন্ত্রনাটা আরও ভয়ঙ্কর!
হাতে ধরা মোবাইলের ওপারে তখন ওই ব্যক্তির স্ত্রী। কিছু আগেই ১ বছরের সন্তানের মৃত্যুর খবর এসেছে ফোনে। তারপর থেকেই রাস্তা হাঁটা শুরু। বাস, ট্রেন কিছু পাওয়া যাবে না। ছেলেটাকে শেষবারের মত দেখতে ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে তাঁর। নাওয়াদা থেকে হাঁটা শুরু করে দেন। কিন্তু পথে আসে বাধা।

চিত্র সাংবাদিক অতুল যাদব জানতে পারে ওই ব্যক্তির নাম রাম পুকার। জিজ্ঞেস করেন, ‘কোথায় যাবেন?’ ক্লান্তি কন্ঠস্বর শুধু বলে উঠতে পারে ‘উধার।’ আঙুল দিয়ে দেখান রাস্তাটা। সাংবাদিক তাঁর অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে জানান, আঙুল দেখে মনে হয়েছিল যমুনা নডির ধার দিয়ে দিল্লির বর্ডারের দিকে, মানে খুব বেশি দূর নয়। তারপর আস্তে আস্তে জানতে পারেন, ‘উধার’ মানে বেগুসরাই, বিহার। সব মিলিয়ে ১২০০ কিলোমিটার রাস্তা।
নিজামুদ্দিন ব্রিজে তাঁকে পুলিশ আটকে দিয়েছে। তিনদিন ধরে সেখানেই আটকে আছেন তিনি। জানান, নজফগড়ে শ্রমিকের কাজ করতেন। অন্যান্যদের মতই হাঁটতে শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু পুলিশ আটকে দেওয়ার পরই ভেঙে পড়েন। হারিবে যায় সব শক্তি।
সাংবাদিকের অনুরোধে পুলিশ তাঁর দিকে ফিরে তাকান। একজন সাংবাদিক অনুরোধ করছেন বলে পুলিশ তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, তাঁকে গত বৃহস্পতিবার তাঁকে নয়াদিল্লিউ স্টেশনে পৌঁছে দেয় পুলিশ। শ্রমিক স্পেশাল ট্রেনে বাড়ি ফেরেন তিনি।
রাম পুকার হয়ত ছবি হয়ে থেকে যাবে। ঠিক যেমন আলান কুর্দি রয়ে গিয়েছে। যে শিশুটাকে স্যুটকেসে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেও বেঁচে থাকবে অসহায় ভারতবর্ষের ছবি হয়ে। আর রাস্তায় কী থেকে যাবে আরও অনেক রাম পুকার? যাদের ছবি উঠবে না কোনও ক্যামেরায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close