International

চিকিৎসায় গাঁজার ব্যবহার, চালু হলো ‘মা’রিজুয়ানা ক্লিনিক’

‘গাঁজার তেল ব্যবহার করে আমা’র বাতের ব্যথা সেরে গিয়েছে। সেইসঙ্গে অনিদ্রায় ভুগতাম আমি। সে সমস্যা থেকেও মুক্তি পেয়েছি। আগে গাঁজার উপকারিতা স’ম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না আমা’র। তবে এখন এর সুফল ভোগ করছি।’ এমনটিই জানিয়েছেন ৬৯ বছর বয়সী ওয়ারাপ’র্ন বোনস্রি।

বিশ্বের অনেক দেশেই গাঁজার সেবনে রয়েছে বৈধতা। তবে মা’দক হিসেবেই এর পরিচিতি বিশ্ব জুড়ে। জানেন কি? প্রাচীনকাল থেকেই গাঁজা চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে ওতোপ্রোতভাবে জ’ড়িত। নির্দিষ্ট পরিমাণ গাঁজার ব্যবহারে শারীরিক কোনো ঝুঁ’কি নেই বরং মিলবে উপকার। সম্প্রতি, থাইল্যান্ডে যাত্রা শুরু করেছে মা’রিজুয়ানা ক্লিনিক। যেখানে গাঁজা দ্বারা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা হবে।

গাঁজা আসলে কী’?

মা’দক হিসেবে গাঁজার ব্যবহার খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ সাল থেকে। হিন্দুধ’র্মের অথর্ব বেদ এবং পুরাণেও গাঁজার কথা উল্লেখ আছে। পুরাণে উল্লেখ আছে, দেবতারা গাঁজা গাছের জন্ম দিয়েছেন। তাদের সমুদ্র মন্থনকালে অমৃ’ত থেকে গাঁজা গাছের উৎপত্তি। ইউরোপে গাঁজা ব্যাবহারের তথ্য পাওয়া যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ সালে গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাসের লেখায়।

গাঁজার তেল

গাঁজার তেল
মা’রিজুয়ানা ক্লিনিক

গাঁজা দিয়ে চিকিৎসা করা হচ্ছে, তাও আবার দুরারোগ্য ব্যাধির! অবিশ্বা’স্য হলেও সত্যি। থাইল্যান্ডে গাঁজার সাহায্যে চিকিৎসা করা হচ্ছে। এজন্য তৈরি হয়েছে একটি হাস*পাতালও। বিশ্বে এই ধরনের হাস*পাতাল এটাই প্রথম। থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ নাখন রাতচাসিমায় আনুষ্ঠানিকভাবে এই মা’রিজুয়ানা ক্লিনিকটি যাত্রা শুরু করে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে গাঁজার ব্যবহার বাড়াতে গত ৬ জানুয়ারি এই হাস*পাতাল চালু করা হয়। প্রথম দুই সপ্তাহ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হবে।

এই হাস*পাতালে প্রাথমিক পর্যায়ে দুই ভাগে সেবা দেয়া হবে রোগীদের। প্রথমে গাঁজার তেল দ্বারা- পেশি ব্যথা, মৃগী রোগ এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপির ফলে হওয়া নিউরোপ্যাথিক ব্যথা এবং বমি বমি ভাব সারানো হবে। দ্বিতীয়, গাঁজা দিয়ে তৈরি ওষুধ দ্বারা চিকিত্সা করা হবে। যেমন- দীর্ঘস্থায়ী রোগগুলো যাদের ঘুমের অ’সুবিধা, ক্ষুধা না লাগা, বুক থেকে পেটের তীক্ষ্ণ ব্যথা, দূর্বলতা, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেশি ব্যথা এবং স্ট্রোকের রোগীদের শরীর দুর্বলতার মতো নির্দিষ্ট রোগগুলো সারাতে গাঁজা ব্যবহার করা হবে।

এই ক্লিনিকটি প্রাথমিকভাবে একজন চিকিৎসক এবং তিনজন সহ চিকিৎসক দ্বারা পরিচালি হচ্ছে। আরো ১০ জন প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এরই মধ্যে, প্রথম দিন প্রায় ১০০ এবং দ্বিতীয় দিন ৫০০ জন চিকিৎসার নিয়েছেন। যদিও সরকারিভাবে এখনো ক্লিনিকটি বৈধতা পায়নি। তবে কিছুদিন পরেই গাঁজা দ্বারা চিকিৎসায় সুফল মিললে সরকার কর্তৃক অনুমোদন মিলবে। এখন পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ২০০ রোগী এই ক্লিনিকে রেজিস্ট্রেশন করেছে বলে সেখানকার এক স্বাস্থ্য কর্মক’র্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন।

থাইল্যান্ডের মা’রিজুয়ানা ক্লিনিকের উদ্বোধন

থাইল্যান্ডের মা’রিজুয়ানা ক্লিনিকের উদ্বোধন
কৃষিখাতের আয় বৃদ্ধির জন্য ২০১৭ সালে গাঁজাকে চিকিৎসায় ব্যবহার ও গবেষণা কাজে ব্যবহারের বৈধতা দেয় দেশটি। থাইল্যান্ডে গাঁজা ব্যবহার করে চিকিৎসার জন্য ২৫টি ক্লিনিক রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ কর্মীর অভাবে এগুলো সপ্তাহে দু-একদিন খোলা থাকে। গাঁজা চাষ, উৎপাদন ও বিক্রির জন্য থাইল্যান্ডে সীমিত পরিসরে লাইসেন্স দেয়া হয়। তবে গত বছর থাই সরকার মা’দক তালিকা থেকে গাঁজাকে বাদ দিয়েছে। এরপর থেকেই প্রতি বাড়িতে ছয়টি গাঁজার চারা আবাদের সুযোগ দেয়ার জন্য খসড়া আইন তৈরি করা হয়।

গাঁজা নিয়ে হয়েছে যু’দ্ধ

আফিমের নে’শায় বুঁদ হয়ে চীনের টালমাটাল অবস্থা শুরু হয়। চীনে জাহাজ ভরে আফিম পাচার করত ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা, বিনিময়ে তারা পেত রুপার মুদ্রা। ওই সময় ভারতে আফিমের চাষ ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন আফিম চাষ করা হতো সরকারি উদ্যোগে। ব্রিটিশদের এ ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে ক্ষেপে যায় চীন। এমনকি তা যু’দ্ধ অবধি গড়ায়। এটি ইতিহাসে আফিমের যু’দ্ধ নামে পরিচিত হয়ে আছে।

মূলত এ যু’দ্ধের পরপরই সারা বিশ্বে মা’দকের বি’রুদ্ধে আ’ন্দোলন শুরু হয়। অনেক দেশ মা’দক নিষিদ্ধ করে নানা আইন করে। তবে ২০১০ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র গাঁজার বৈধতার পক্ষে এক আ’ন্দোলন করে। তারই জেরে ২০১২ সালে সেখানকার কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গাঁজা বৈধ করার হয়। এরপর থেকে মা’দক হিসেবে নয় বরং সুস্বাস্থ্য রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে গাঁজার ব্যবহার বাড়তে থাকে।

গাঁজার চাষ

গাঁজার চাষ
এবার তবে জেনে নিন গাঁজা কোন কোন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়-

১. নির্দিষ্ট পরিমাণ গাঁজা ব্যবহার করলে মৃগী জাতীয় স্নায়ু রোগের উপশম ঘটে। এমনটাই জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। ২০১৩ সালেই তাদের এই গবেষণা, ফার্মাকোলজি এন্ড এক্সপেরিমেন্টাল থেরাপিউটিক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়।

২. যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল আই ইন্সটিটিউট জানায়, গ্লুকোমা চোখের এমন এক রোগ যাতে অন্ধত্ব আনে। প্রায় ১০ বছর আগে এই বিষয়টি জানা গেছে। তবে গাঁজা গ্লুকোমা রোধে সাহায্য করে।

৩. স্মৃ’তি বি’ভ্রাট ঘটে যাদের তাদের জন্য গাঁজা বেশ কার্যকরী এক উপাদান। এটি মস্তিস্ককে দ্রুত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করে। এমনটাই জানিয়েছেন দ্য জার্নাল অব অ্যালঝাই’মা’র ডিজিজ।

৪. যুক্তরাষ্ট্রের ক্যান্সার বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্যান্সার অর্গ-এ জানানো হয় গাঁজা টিউমা’রের ঝুঁ’কি কমায়। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদন অনুসারে। গাঁজা টিউমা’র প্রতিরোধকের ভূমিকা পালন করে।

গাঁজার ব্যবহার

গাঁজার ব্যবহার
৫. ক্যান্সার রোগীদের নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয়। এক্ষেত্রে গাঁজা কেমোথেরাপির পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কমায়। ইউএস এজেন্সি ফর ড্রা’গ জানিয়েছে এই তথ্য।

৬. গাঁজা মস্তিষ্ক সুরক্ষায় সহায়তা করে। ফলে স্ট্রোকের ঝুঁ’কি কমায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নটিংহাম এমনটিই জানিয়েছে।

৭. গাঁজা সেবনে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে না বরং বাড়ে। জার্নাল অব দ্য আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে প্রকাশিত এক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে এই তথ্যের। ৫ হাজার ১১৫ জন রোগীর উপর ২০ বছর চালানো ওই গবেষণায় দেখা গেছে, তামাক সেবনকারীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে অথচ গাঁজা সেবনকারীদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close