offbeat news

লকাউনে চুল বেড়ে বটগাছ, ১৮৭৯-র বিলেতি ‘ভাইরাসে’ শহরে শুরু হয়েছিল ‘শেভিং স্ট্রাইক’

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায় :  করোনার আঘাতে অনেক পেশাই মহা সমস্যায়। অন্যতম ক্ষৌরকর্ম, কারণ এই পরিষেবায় সমস্যা উভয় দিকেই। সাধারণ মানুষ থেকে তারকা। দাড়ি , চুল একগাদা বাড়িয়ে জ্যৈষ্ঠের দুপুরে গলদঘর্ম হয়ে যাচ্ছেন তবু দোকানে যাচ্ছেন না ভয়ে, স্বাভাবিক। অনেকে নিজেই কেরামতি করে নিচ্ছেন। সরকারও অনেক পেশায় ছাড় দিলেও ক্ষৌরকর্মে ছাড় দেননি। ফলে মার খাচ্ছে ব্যাবসা। দিনের শেষে নাপিতের কাজ কর্মে প্রায় দু মাস ধরে ‘সোশ্যাল স্ট্রাইক’। আজ থেকে বহু বছর আগে বহু দিন ধরে বন্ধ ছিল নাপিতদের চুল দাড়ি কাটার কাজ। সেও ছিল এক স্ট্রাইক। তবে তা অন্য ভাইরসের জেরে। ইতিহাস বলছে যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। উৎস এই বাংলা।

আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগের ঘটনা। তখন দেশে বর্তমান ইংরেজ তথা ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি ‘ভাইরাস’। যা জাঁকিয়ে ভারতে বসেছিল প্রায় ২০০ বছর ধরে। নাপিতরা ক্ষৌর স্ট্রাইক শুরু করেছিল কলকাতায়। হয়েছিল বিশাল প্রতিবাদ। কারণ অতিরিক্ত করের বোঝা। যা তুলতে তৎকালীন মহানগর গর্জে উঠেছিল নাপিতদের ‘চলছে না , চলবে না শব্দে।’ ইতিহাসের পাতায় এর নাম ‘ক্ষৌরকার ধর্মঘট’।

ইংরেজ শাসকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আয়ের উৎস বাড়ানো এবং সে জন্য বৃত্তিকর বা লাইসেন্স ব্যবস্থাকে জোরদার করা। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি জাতিগত পেশায় নিযুক্ত শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে নাপিত, ধোপা, কসাই, মেথর প্রমুখের উপরে বৃত্তিকর ধার্য্য হয়েছিল। করের জোরেই দেশে শক্ত হয়েছিল ইংরেজ শাসনের খুঁটি। এই করতে গিয়ে ইংরেজ প্রশাসন ক্ষৌরকর্মীদের উপরে বছরে ১২ টাকা হারে লাইসেন্স ফি ধার্য্য করে। এর বিরুদ্ধেই হয়েছিল ‘ক্ষৌরকার ধর্মঘট’।

সেই সময়ে সামাজিক নিয়ম রীতি ইত্যাদির কারণে পেশার বা বৃত্তির পরিবর্তন করা যেত না। ইংরেজদের ধারনা ছিল পেশাগত নিরাপত্তার কারণেই তাঁরা সেই কর দিতে বাধ্য থাকবে। মেনে নেন নি ক্ষৌরকাররা। মুখে ভাত থেকে শ্রাদ্ধ, প্রত্যেকটি হিন্দু সামাজিক কাজে যাদের প্রয়োজনীয়তা পদে পদে তাঁদের উপর এমন কর! কলকাতায় গঙ্গার ধারে জগন্নাথ ঘাটে ক্ষৌরকর্মীরা এক সমাবেশে মিলিত হন, সেখানে তাঁরা দু’দফা দাবির সঙ্গে ১২ টাকার লাইসেন্স ফি রদ করার দাবি তোলেন। এই ধর্মঘট শুরু হবার কয়েক দিনের মধ্যেই তৎকালীন সমাজে ভীষণ অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন ‘সুলভ সমাচার’ পত্রিকায় সেই ধর্মঘটের প্রমাণ মেলে। বঙ্গদেশে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের প্রভাব ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য প্রান্তেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৮৬৩ সালে তৎকালীন বোম্বাই শহরে প্রায় তিন হাজার ক্ষৌরকার পেশা সংক্রান্ত দাবিদাওয়ার ভিত্তিতে ধর্মঘট করেছিলেন।
(তথ্যসূত্র : রানা চক্রবর্তী ও বাংলায় ধর্মঘট, লেখক – অশোক ঘোষ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close