offbeat news

সচিন ‘ঈশ্বর’ নন, পরিযায়ী শ্রমিক থেকে কৃষক বিক্ষোভ সেটাই প্রমাণ করল

সুমন ভট্টাচার্য : সচিন তেন্ডুলকর। এবং অমিতাভ বচ্চন। এই দু’জনে আসলে প্রমাণ করে দিলেন ক্রিকেট অথবা অভিনয়ের কোনও ঈশ্বর-টিশ্বর হয় না! যেটা হয়, সেটা আসলে কিছুটা স্বার্থ, অনেকটা অর্থ রোজগার এবং সময়, মানে ‘এক্সপায়েরি ডেট’ পেরিয়ে যাওয়ার পরেও নিজেদের পুরনো ব্র্যান্ড ইক্যুইটিকে ভাঙিয়ে বাকি জীবনটা ‘রসে-বশে’ কাটিয়ে দেওয়া।

তা নাহলে কি ব্যাখ্যা আছে সচিন তেন্ডুলকরের কৃষক বিক্ষোভ নিয়ে সরকারের সুরে সুর মেলানোর? কি বা ব্যাখ্যা ছিল কেরালার বামপন্থী সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, কিন্তু পরে আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার বা আইএমএফ-র অন্যতম অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথের সম্পর্কে বলতে গিয়ে ‘বিগ বি’-র তাঁর রূপের প্রশংসা করার? এই সবই প্রমাণ করে দেয়, আসলে ভারতে আমরা যাঁদের ‘ঈশ্বর’ বলি, দেবতার ন্যায় সম্মান করি, তাঁরা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে থাকেন!

ভারত নামক রাষ্ট্রটির সমস্যা হচ্ছে, তার ধনীরা করোনার সঙ্কটের সময় গরিবদের পাশে দাঁড়ান না। যে মালিকের কারখানায় বা যে মালিকের নির্মাণ কার্যে শ্রমিকরা কাজ করছিলেন, তারা যদি বন্দোবস্ত করতো, তাহলে তো লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকদের রেললাইন ধরে বা জাতীয় সড়ক ধরে হেঁটে বাড়ি ফিরতে হতো না।

যে সব সেলিব্রিটিরা, পড়ুন ‘খান’ এবং ‘বচ্চন’রা, আম্বানীর বাড়িতে কয়েক’শো কোটি টাকার বিয়েতে সহাস্যে খাবার পরিবেশন করেন, কিন্তু তাঁদের কাউকে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কোনও লঙ্গরখানা বা কিছু খুলতে দেখা যায়নি। বড়লোক শিল্পপতিদের বাড়িতে দিওয়ালি হোক কিংবা হোলি, পাপারাৎজিদের ক্যামেরায় সচিন তেন্ডুলকরের ছবি আমরা বারবার দেখেছি। কিন্তু সেই মুম্বইতে যখন শ্রমিকরা বাড়ি ফেরার জন্য হন্যে হয়ে উপায় খুঁজছিলেন, তখন তেন্ডুলকরের চাইতে রোজগারের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা সোনু সুদ ছাড়া কোনও তারকাকে নজরে পরেনি। পরিযায়ী শ্রমিকরা তো আর আইপিএলে ফ্র্যাঞ্চাইজি কিনবেন না, সিনেমায় বিনিয়োগ করেন না, দেশজোড়া টেলিভিশন নেটওয়ার্কও চালান না। তাহলে তাঁদের জন্য সচিন তেন্ডুলকর কেন-ই বা ভাবতে যাবেন?

কিন্তু যেহেতু সচিন তেন্ডুলকর ভারতীয় ক্রিকেটের ‘ঈশ্বর’, তাই তাঁর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বলবেন না। ভারতীয় ক্রিকেটের এই ‘ঈশ্বর’-এর আত্মজীবনী পড়লে মনে হবে, ক্রিকেটে বেটিং বলে কিছু ছিল না। ওই রকম একট ঝঞ্ঝা-বিধ্বস্ত সময়ে যিনি ভারতীয় ক্রিকেটের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ছিলেন, তিনি কীভাবে গোটা বিষয়টাকে এড়িয়ে যান? আসলে ‘যেমন বেনী তেমনি রবে, চুল ভেজাবো না’ এই তত্ত্বেই বিশ্বাসী ভারতীয় ‘আইকন’ বা সেলিব্রিটিদের কাছ থেকে এর চাইতে বেশি কী বা প্রত্যাশা করা যেতে পারে?

বিদেশে শিল্পপতিরা যা মুনাফা করেন, তাঁরা একটা বড় অংশই ব্যবহার করেন সমাজ কল্যাণের কাজে। সেই কারণেই ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় এত বিশ্ববিদ্যালয় বা গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, সম্মানের সঙ্গে কাজ করে একের পর এক নোবেলজয়ী উপহার দিয়েছে। এমন কি অ্যামাজনের মালিক জেফ বেজোর-এর প্রাক্তন স্ত্রী, যিনিও একসময় হাতে হাত লাগিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে তৈরি করেছিলেন, তিনিও বিবাহ বিচ্ছেদের পরে পাওয়া নিজের সম্পত্তি থেকে বড় অংশই ব্যয় করছেন সমাজ কল্যাণের বিভিন্ন কাজে। এই সব উদাহরণের পাশে যখন আমাদের দেশের শিল্পপতিদের ছেলে বা মেয়ের বিয়েতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচের বা ‘মোচ্ছব’-এর গল্প সামনে আসে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না জাতি হিসেবে আমাদের সমস্যাটা কোথায়? এবং রাষ্ট্র হিসেবে কেন মানব উন্নয়নের সূচকে আমরা পিছিয়ে আছি!

কৃষক বিক্ষোভ নিয়ে সচিন তেন্ডুলকরের সোশ্যাল মিডিয়ার পোষ্ট নিয়ে নেট নাগরিকদের একাংশ যে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে, তার যৌক্তিকতা বুঝতে তাই অসুবিধা হয় না। ক্রিকেটের ‘ঈশ্বর’ বিদেশ থেকে ফেরারি গাড়ি কিনে ফিরলে কেন্দ্রের বাজপেয়ী সরকার তাঁর কর মুকুব করে দেয়, মনমোহন সিংহের সরকার তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠালে তিনি দেশের সংসদের গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তাকে ‘উপলব্ধি’ করে না যাওয়াটাকেই অভ্যেসে পরিণত করে নেন, আর বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার হয়ে কীভাবে কীভাবে এনডোর্সমেন্ট করে আরও কোটি কোটি টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে ঢুকিয়ে ফেলা যায়, তার পরিকল্পনা করতে থাকেন। অতএব কেরালাবাসী সেই উইম্বলডনে টেনিস তারকা মারিয়া শারাপোভা তেন্ডুলকরকে ‘চিনতে’ না পারার ঘটনাকে যদি এতদিন বাদে মনে করিয়ে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে, এবং সেই সুদূর থেকেও স্বয়ং শারাপোভা তাই নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান, তাহলে বুঝতে হবে অনেক দিনের পুরনো বাংলা নাটকে একটা গান আজও কি ভাবে ফিরে ফিরে আসে। ‘কথা বলো না, কেউ শব্দ করো না, ভগবান নিদ্রা গিয়েছেন, গোলযোগ সইতে পারেন না’।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় ক্যাসিয়াস ক্লে ওরফে মহম্মদ আলির কী ভূমিকা ছিল, বা ইউরোপে ছাত্র বিক্ষোভের সময় বব ডিলান কী গান গেয়েছিলেন, এইসব উদাহরণ আসলে ভারতীয় হিসেবে আমাদের যন্ত্রণা বাড়াবে। এখানে সবাই ‘সু-নজরে’ থাকতে চায়, শিল্পপতিদের বাড়ির অনুষ্ঠানে সব কাজ করে দিতে পারেন, কিন্তু পরিযায়ী শ্রমিক বা কৃষকরা তাঁদের জীবনের মানচিত্রে নেই।

লাল-নীল-গেরুয়া…! ‘রঙ’ ছাড়া সংবাদ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন খবরটা ‘খাচ্ছে’? সেটাই কি শেষ কথা? নাকি আসল সত্যিটার নাম ‘সংবাদ’!

‘ব্রেকিং’ আর প্রাইম টাইমের পিছনে দৌড়তে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকেছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার। অর্থ আর চোখ রাঙানিতে হাত বাঁধা সাংবাদিকদের।

কিন্তু, গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভে ‘রঙ’ লাগানোয় বিশ্বাসী নই আমরা। আর মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনারাই। সোশ্যালের ওয়াল জুড়ে বিনামূল্যে পাওয়া খবরে ‘ফেক’ তকমা জুড়ে যাচ্ছে না তো? আসলে পৃথিবীতে কোনও কিছুই ‘ফ্রি’ নয়। তাই, আপনার দেওয়া একটি টাকাও অক্সিজেন জোগাতে পারে। স্বতন্ত্র সাংবাদিকতার স্বার্থে আপনার স্বল্প অনুদানও মূল্যবান। পাশে থাকুন।.
হ্যাঁ, আমি অনুদান করতে ইচ্ছুক >

Caption: Work from Home এর বাস্তব ছবি নিয়ে আলোচনায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অনিরুদ্ধ দেব।

Back to top button