offbeat news

সামান্য তেলের শিশি ভাঙার ঘটনা হয়ে দাঁড়াল দেশভাগের প্রতিবাদী কবিতা

সৌপ্তিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কলকাতা: ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর উপর রোগ করো, তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো’। দেশ ভাগ নিয়ে বিখ্যাত এই কবিতা কে না জানে? লেখক কে? জেন ওয়াই অনেকেই তাঁকে চেনেন না। কিন্তু যারা চেনেন তাঁদের বেশিরভাগের কাছেই অজানা এই বিখ্যাত কবিতা রচনার পিছনে কারণ কি ছিল অন্নদাশঙ্কর রায়ের। ভারতের স্বাধীন হতে তখন আর মাস ছয়েক বাকি। র‍্যাডক্লিফ লাইন দিয়ে দেশের সীমানা পরিমাপের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। মানে দেশ ভাগ নিশ্চিত। মানে ওই ফেব্রুয়ারি মাস। তখনও ভালোই ঠাণ্ডা রয়েছে বাংলায়।
সাহিত্যিকের অভ্যাস ছিল নারকেল তেল গায়ে মেখে স্নান করা। এখানেই বিপত্তি ঘটায় তার ছোট্ট কন্যা। ঠিক করেছিলেন রোদে দিয়ে জমে যাওয়া তেল মাখবেন। সে আর হল কই। স্নান করতে যাওয়ার আগে স্ত্রী লীলা রায়কে বলেন তেলের শিশি দিতে। স্ত্রী ব্যস্ত রান্নায়। বারান্দায় খেলছিল তাদের বছর দুইয়ের কন্যা তৃপ্তি। ডাকনাম খুকু। স্ত্রী খুকুকে বলেন বাবাকে তেলের শিশি দিয়ে আসতে। শিশু, তখনও পা টলমল। বাবাকে সেই শিশি দিতে গিয়ে খুকুর হাত থেকে তা পড়ে গিয়ে ভেঙে যায়। রেগে গিয়ে খুকুকে খুব বকা দেন লীলা রায়। বকাঝকা শুনে সাহিত্যিক ঘরে এসে স্ত্রী’কে বলেন ‘সামান্য একটি তেলের শিশি ভাঙল রাগ করছো, এদিকে দেশ ভাঙছে’।
বলেই স্নানে না গিয়ে ঘরে ঢুকে যান, টেবিলে গিয়ে কাগজে কলম নিয়ে লিখতে শুরু করে দেন। দেশ ভাগে মরমাহত সাহিত্যিক বিখ্যাত সেই ‘খুকু ও খোকা’ কবিতা। প্রসঙ্গত, ১৯৩০ সালে মার্কিন কন্যা অ্যালিস ভার্জিনিয়া অনফোর্ডকে বিবাহ করে অন্নদাশঙ্কর রায়। তাহলে লীলা রায় কে? অ্যালিস ভার্জিনিয়াকে সাহিত্যিক নাম দেন লীলা রায়। লীলা রায় বহু বই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন। অন্নদাশঙ্করের অনেক লেখা ‘লীলাময়’ ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়েছিল।

তার জন্ম ১৯০৪ সালের ১৫ মার্চ ব্রিটিশ ভারতে বর্তমান উড়িষ্যার ঢেঙ্কানলে। বাঙালি কবির প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ওড়িয়া ভাষাতেই। রসিয়ে বলতেন, ‘ওড়িয়া-বাংলাকে মিশিয়ে দিয়েছি’। ১৯২৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় আঠারো বছরের মধ্যে তিনি নয় বছর পশ্চিমবঙ্গে এবং নয় বছর পূর্ববঙ্গে বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি উচ্চতর পর্যায়ের ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের (আই.এ.এস) সদস্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসন ও বিচার বিভাগে কাজ করেন। দেশভাগ, রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিষয়কে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় ১৯৫০ সালে পদত্যাগ পত্র দেন এবং ১৯৫১ সালে তিনি বিচার বিভাগের সচিব পদ থেকে অব্যাহতি পান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close