Entrepreneur

স্বল্প পুঁজিতে সফল উদ্যোক্তা আফসানা

উদ্যোক্তা – আফসানা আফরিন

চাকরী করার চেয়ে উদ্যোক্তা হওয়া বেশি সাফল্যের মনে করতেন আফসানা আফরিন। কারণ তিনি মনে করতেন চাকরী করলে অনেক ক্ষেত্রে একই কাজ বারংবার করায় একঘেয়েমি চলে আসে; ক্রিয়েটিভিটি অনেকাংশে নষ্ট হয়। অন্যদিকে উদ্যোক্তা হবার মজাটাই হলো প্রতিদিন নতুন নতুন আইডিয়া চিন্তা করা এবং নতুন কিছু শেখা আর নিজের প্রতিষ্ঠানে কাজে লাগানো। আফসানার নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তার বিকশিত করার জন্যই উদ্যোক্তা হয়ে ওঠা।

রান্না শখের বসেই করতেন আফসানা। বাবা ও মা দুই পক্ষের আত্মীয় স্বজন প্রায় সবার রান্নার হাত ভাল। তাছাড়া ছোটবেলা থেকেই ছুটির দিনে বাবার হাতের বিরিয়ানি, খিচুড়ি কিংবা ঈদের ছুটিতে মামা-চাচাদের  পিকনিকে করা রান্না খেয়ে বড় হয়েছেন আফরিন, আর এই ব্যাপারগুলো খুব করে মনে গেঁথে ছিল। তাই সুযোগ পেলে বা মন খারাপ হলে রান্না করতেন আফরিন। শখ করে কাছের মানুষ বন্ধুদের দাওয়াত দিতেন বক্সে করে ক্লাসে নিয়ে যেতেন মাঝে মাঝে এবং প্রশংসা পেতেন তাদের কাছে থেকে। সেই খাবারের ছবি তুলেও নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে দিতেন এবং সবার কাছ থেকে ভাল মন্তব্য শুনতেন। আর এভাবেই সবার কথা মাথায় রেখে আফসানা হয়ে উঠলেন উদ্যোক্তা। ৮০০০ টাকার পুঁজি নিয়ে শুরু করেছিলেন আফসানা। নামও দিয়েছেন ‘অবসরের দিনলিপি বাই আফসানা’

শখের বসে রান্না করতে গিয়ে সেভাবে রেসিপি আলাদা করে লিপিবদ্ধ রাখেননি কখনো। গত বছর “চুইঝাল” থেকে রেসিপি কন্টেস্টের ঘোষণা দেখে কোনো কিছু না ভেবেই সাধারণত কয়েকটি রেসিপি শেয়ার করেন আফরিন। এই বছর আদর্শ প্রকাশনীর “চুইঝাল নির্বাচিত ১০০ রান্না” বইটিতে দুটি রেসিপি জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া “COOKUPS Zerocal Dessert Contest 2019” এ টপ ১৬ তে জায়গা করে নেয় বলে জানান আফরিন।

আফসানা উদ্যোক্তা বার্তাকে বলেন, অবসরে মূলত ক্রাফটিং এর কাজ, গাছ লাগানো, রান্না করে সময় কাটে। যেহেতু প্লাস্টিক পলিউশন কমানো নিয়ে কাজ করছি অনেক দিন তাই হাতের কাছে পাওয়া যায় এমন সব প্লাস্টিক বর্জ্য রিসাইক্লিং নিয়েও খুব ভেবে ভেবে কাজ করছি। সচেতনতা বাড়াতে অনলাইন ও অফলাইনে সাধ্যমতো কাজ করেছি। এরই ধারাবাহিকতায় “রুমানার রান্নাবান্না” নামের একটি কুকিং ইউটিউব চ্যানেলের সাথে কলাবোরেশন করে একটি ভিডিও করেছি।

প্লাস্টিক রিসাইকেল করে গাছ লাগাতেন বলে বাসার স্টোর রুমে পড়ে থাকা আড়ং দইয়ের অনেক গুলো বাক্স কেজি দরে বিক্রি না করে রঙ করে গাছ লাগিয়ে বা শো-পিস বানিয়েছিলেন। যার কারণে “আড়ং ডেয়েরি ইয়োগহার্ট টাব কনটেস্ট “( Aarong Dairy Yoghurt Tub Contest) এ সেরা পাঁচে জায়গা করে নিয়েছিলেন।

আফসানা আফরিন বলেন, কিছু মন্দ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় কিন্তু ভালো লাগার মতো মুহূর্ত অনেক আসে। ডেজার্ট বানানোর সময় একটা অংশ থাকে বাসার আর গিফটের জন্য। বন্ধুদের সাথে এই ব্যাপারগুলোতে সহযোগিতা পান অনেক।

কিছু কিছু ফুডের ডিমান্ড এত বেশি থাকে যে, সাপ্লাই দিতে গিয়ে খুব হিমশিম খেতে হয় আফসানাকে। মানে সাপ্লাই এর অর্ধেক ডিমান্ড এই টাইপ অবস্থা! শুরুর দিকে প্রতিটি ডেলিভারির ছবি দিতেন ঠিক কি পরিমাণ পার্সেল যাচ্ছে। এখন দেননা; কারণ দেখা যায় অনেকের অর্ডারই নিতে পারেন না। স্টক লিমিটেশন থাকে এখনে।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা নিয়ে বলেন,পূজার পরেই টিম মেম্বার নিয়ে একেবারে সেট করা মেন্যু নিয়েই হাজির হবার চেষ্টা করব। এই কারণে কয়েক জন কো-ওয়ার্কার মিলেই এরিয়া অনুযায়ী কাজ করা হবে। গুণগত মান আর স্বাদ নিয়ে আমি একটু খুঁতখুঁতে। তাই সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে এই ব্যাপারটি ঠিকঠাক করার। পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানের দিকে বেশি গুরুত্ব দেব।

আফরিন বলেন, “কাজ নিয়ে পরিবারের সাপোর্ট ছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছি। কাজগুলো এমন যে অনেক ক্ষেত্রেই একা করা কষ্টকর। আমার ছোট বোন, কাজিনরা সাধারণত আমাকে বেশ কিছু কাজে সাহায্য করে।”

বর্তমানে পাঁচ জন কো-ওয়ার্কার নিয়ে কাজ করছেন আফসানা। অবসরের দিনলিপিতে পাওয়া যায় ফুড আইটেম। নবাবি সেমাই, শ্রিখান্দ, মিষ্টি নিমকী পিঠা, মুগ পাকন পিঠা, গরুর কালাভুনা,স্পাইসি চিকেন, পোলাও রোস্ট লাঞ্চ বক্স ইত্যাদি। যা ৪৫- ২১০০ টাকার মধ্যে।

ফুড আইটেমের চাহিদা বেশি থাকলেও ডেলিভারি দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়।কারণ বাংলাদেশে ফুড ডেলিভারি দেয় এমন কোম্পানি খুব কম। আর যে কয়েকটি কোম্পানি আছে তাদের চার্জ এত বেশি যে ক্রেতারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

ফুড নিয়ে কাজ করার আগে প্রায় দেড় বছর ধরে প্লাস্টিক পলিউশন এবং গাছ লাগানো নিয়ে কাজ করছেন নন-প্রফিট অর্গানাইজেশনে। এছাড়াও টুকটাক ক্রাফটিং করেন, গয়না বানান সব কিছুই একেবারে শখের বশে করে থাকেন।

আফসানা আফরিনের মূলত প্রায় সব কাজের আনুষ্ঠানিক শুরুই হয় “গ্রীণ হোপার GREENHOPER” থেকে। কোনো সময় অনেক টাকা হলে একটা জাদুঘর কাম রিসোর্ট করার ইচ্ছা যেখানে বিলুপ্তপ্রায় জানা কিংবা অজানা অসংখ্য গাছ থাকবে যা বাংলাদেশের আবহাওয়ায় সহজেই জন্মায়। মানুষ স্বল্পমূল্যের টিকিট কেটে রিসোর্টে ঢুকে সেখানে থাকা প্রায় সব প্রজাতির গাছ চিনবে,পরিচর্যা-যত্ন কিভাবে করতে হয় হাতে কলমে শিখবে, জানবে। বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের জন্য ক্যাম্পেইন করা হবে যাতে তারা গাছ লাগাতে আগ্রহী হয় আরো বেশী। এছাড়াও ছাদে একুয়াকালচার ও এগ্রি কিভাবে স্বল্প বাজেটে করা যায় – এ নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরে পড়াশোনা করছেন আফসানা। এমন নতুন নতুন চিন্তা ভাবনাগুলোকে এভাবে কাজে লাগিয়ে সফল হতে চান আফসান।

 

খাদিজা ইসলাম স্বপ্না

Leave a Reply

Back to top button
Close